বায়ার্ন মিউনিখ ৩-১ প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনঃ ট্যাক্টিক্যাল এনালাইসিস

প্যারিসে ৩-০ তে বিধ্বস্ত হবার পর বরখাস্ত হলেন কার্লো আনচেলত্তি, ডাগআউটে ফিরে এলেন ট্রেবল জয়ী জনপ্রিয় কোচ ইয়ুপ হেইনক্স। নিজেদের চেনা ছন্দে ফিরে আসলো ব্যাভারিয়ানরা – গুনে গুনে প্যারিসিয়ানদের জালে ৩ বার বল পাঠিয়ে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনকে এলিয়াঞ্জ এরেনা নামক নরকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন লেওয়ানডস্কি, রিবেরি, কোমান, টলিসোরা। আনচেলত্তির রেখে যাওয়া বায়ার্নে কি পরিবর্তন আনলেন হেইনক্স যার জন্যে এই সম্পুর্ন বিপরীত ফল?

প্যারিসেই সেই ম্যাচে ফিরে যাই আগে। সেদিন ৪-৩-৩ এ খেলতে নামা পিএসজির লাইন আপ ছিলঃ
আরেওলা
দানি আলভেজ – সিলভা – মার্কুইনহোস – কুরাজাওয়া
ভেরাত্তি – মোত্তা – র‍্যাবিওট
এম্বাপ্পে – কাভানি – নেইমার

অপরদিকে সফরকারী বায়ার্নের ৪-৩-৩ এর লাইন আপ ছিলঃ
উলেরিচ
কিমিচ – সুলে – জাভি মার্টিনেজ – আলাবা
ভিদাল – থিয়াগো – টলিসো
মুলার – লেওয়ানডস্কি – হামেস

খেলার শুরুতেই নেইমারের অসাধারন সলো রান এবং আনমার্কড দানি আলভেজের দুর্দান্ত ফিনিশিং এ এগিয়ে যায়। পিছিয়ে পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই বায়ার্ন আক্রমনাত্বক খেলা শুরু করে এবং পিএসজি লিড ধরে কাউন্টারের সুযোগ খোজা শুরু করে। খেলার শুরুর প্রথম ১০-১৫ মিনিট পিএসজি এগ্রেসিভ হাইপ্রেসিং করলেও এরপর থেকে বায়ার্নকে হাফলাইন পর্যন্ত উঠে আসার স্পেস করে দেয় এবং বায়ার্ন হাফলাইনের কাছে আসলেই পিএসজি প্রেস করা শুরু করে।

পিচের সেন্টারে ভেরাত্তি-মোত্তা-র‍্যাবিওটদের ন্যারো লাইন মাঠের মাঝখান দিয়ে বায়ার্নের এটাক বিল্ড আপ কঠিন করে দেয় এবং থিয়াগো, হামেস, ভিদাল, মুলারদের কেউই পিচের সেন্টারে পিএসজির ডাবল লাইনের মাঝের হোলটায় পজিশন নিয়ে সেন্টার দিয়ে এটাক বিল্ড আপে সাহায্যও করে নাই! এর ফলে বায়ার্নের এটাক গুলি অনেকটা মুখস্থ স্ট্যাটেজীর মতো দুই উইং দিয়ে উঠছিল এবং এটাকিং থার্ডে গিয়ে উইং থেকে বক্সে লেওয়ায়নডস্কি-মুলার-ভিদালদের জন্যে ক্রস করাই ছিল বায়ার্নের স্ট্র্যাটেজী।

সেদিন বায়ার্ন নাম্বার ৯ লেওয়ানডস্কিকে পুরো ম্যাচেই ছায়ার মতো অনুসরন করে যান ব্রাজিলিয়ান সেন্টার থিয়াগো সিলভা এবং সিলভার লাইসেন্স ছিল পিচের যেকোন জায়গাতেই লেওয়ানডস্কিকে স্পেস না দেওয়া। লেওয়ায়নডস্কিকে করা সিলভার কড়া ম্যান মার্কিং এবং মার্কুইনহোস, কুরাজাওয়াদের পজিশনিং এবং ক্লিয়ারেন্সে বায়ার্নের ক্রসগুলি নিষ্ফল হয়ে ফিরে আসতে থাকে। তারপরেও যেই সুযোগগুলি বায়ার্ন পায় সেগুলো ফরোয়ার্ডরা হয় ব্যাড কন্ট্রোল আর নাহয় দুর্বল, লক্ষ্যভ্রষ্ট শটে নস্ট করে।

এক গোলে এগিয়ে থাকা পিএসজি বায়ার্নের হাইলাইন ডিফেন্সের পিছনের স্পেসে এটাক করার স্ট্র্যাটেজী ইউজ করে যায় পুরাটা ম্যাচে। বায়ার্নের প্লেয়াররা এমনিতেও ম্যাচে অর্গানাইজড ভাবে ছিলেন না, যার ফলে ঠিকমতো কাউন্টার প্রেসিংও হচ্ছিল না এবং পিএসজি কাউন্টার এটাক করার সুযোগ পাচ্ছিল। থিয়াগো কিংবা ভিদাল কেউই ঠিকমতো ডেস্ট্রোয়ারের রোল প্লে করতে পারে নাই এবং সেন্টার দিয়ে রান মেইক করা পিএসজির প্লেয়ারদের (কাভানি/নেইমার/এম্বাপ্পে) তারা সেভাবে মার্কও করতে পারে নাই। যার ফলে বায়ার্নের হাইলাইন ডিফেন্সের পিছনের বিশাল স্পেস কাজে লাগিয়ে নেইমার-এম্বাপ্পে-আলভেজদের গতি বায়ার্ন ডিফেন্সের বারবার ত্রাস ছড়াতে থাকে। যার ফলাফল কাভানি, নেইমারের আরো ২ গোল এবং প্যারিসে বায়ার্নের ৩-০ তে বিধস্ত হওয়া।

এই হারের পর বরখাস্ত হন আনচেলত্তি এবং ফিরে আসেন ট্রেবল জয়ী কোচ ইয়ুপ হেইনক্স। ঘরোয়া লীগেও নিজদের আগের রূপ ফিরে পাওয়া শুরু করে বায়ার্ন।

এলিয়াঞ্জ এরেনায় গতকালকের ম্যাচেও পিএসজি খেলতে নামে সেই ৪-৩-৩ ফর্মেশনে। পিএসজির একাদশে পার্থক্য র‍্যাবিওটকে সেন্টারে নিয়ে মোত্তার জায়গায় লেফট মিডে ড্রাক্সলারের অন্তর্ভুক্তি। আর হেইনক্সের বায়ার্ন ৪-৩-৩ এর জায়গায় নামে ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে। কোমান চলে যান রাইট উইঙ্গে, লেফট উইঙ্গে নামেন মুলার পরিবর্তে দলে ঢুকা রিবেরি। থিয়াগো-ভিদালের জায়গায় ডাবল পিভট সামলান রুডি-টলিসো। সেন্টার ব্যাকে জাবি মার্টিনেজের জায়গায় জার্মানির সেরা ডিফেন্ডার ম্যাট হুমেলস।

পিএসজির সেরা তারকা নেইমার জুনিয়র খেলেন লেফট সাইডে তাই বায়ার্ন এদিন প্রথম হাফে নেইমারের সাইড দিয়ে এটাক না করে বয়সের কারনে পিছনের স্পেস রিকোভার করতে না পারা দানি আলভেজের সাইড দিয়েই এটাকে উঠার স্ট্র্যাটেজী নিয়ে নামে। প্রথম গোলটাও আসে এই বায়ার্নের লেফট এবং পিএসজির ডিফেন্সের রাইট সাইড দিয়ে উঠা এটাক দিয়ে এবং ম্যাচে বায়ার্নের ৩টি গোলের সবগুলিরই উৎস ছিল এই লেফট সাইড!

গোলের পর পিএসজি বায়ার্নের হাফে এগ্রেসিভ প্রেসিং শুরু করে। অপরদিকে বায়ার্ন এদিন প্যারিস ম্যাচের মতো হাইলাইন ডিফেন্স না করে নিজেদের হাফে ৪-৪-২ শেইপে ডীপ-ডিফেন্স করা শুরু করে। লেফট উইং দিয়ে এটাকে উঠা নেইমার, নেইমারকে সাহায্য করতে লেফটে চেপে যাওয়া এম্বাপ্পে, লেফট মিড ড্রাক্সলারকে থামাতে নিজেদের ডিফেন্সের রাইট সাইডে ম্যান পাওয়ার ভারি করে রাখে বায়ার্ন। রাইট উইঙ্গার কোমান ও এসময় ভালো ডিফেন্সিভ ডিউটি পালন করেন।

এগ্রেসিভ হাইপ্রেসিং করা এবং উপরে উঠে আসা পিএসজিকে বায়ার্ন এদিন সেরকম হাইপ্রেসিং করতে যায় নাই। প্রেস করলেও তা পিএসজির মতোন এগ্রেসিভ ছিল না এবং বায়ার্ন ডিফেন্সের পিছনে স্পেস না দেওয়ার ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক ছিল। ফার্স্ট হাফে বায়ার্নের আক্রমণগুলি ছিল লেফট উইঙ্গার রিবেরি, লেফট ব্যাক আলাবা আর লেফটে চেপে আসা এটাকিং মিডফিল্ডার হামেসের কম্বিনেশনাল প্লে, ওয়ান-টু-ওয়ানের মাধ্যমে।

বায়ার্ন এগ্রেসিভ প্রেসিং না করলেও পিএসজির হাফে তখনই রুথলেস প্রেসিং করছিল যখন প্যারিসিয়ানদের বল কন্ট্রোল উইক ছিল। এরকম এক দুর্বল বল কন্ট্রোল দেখে বায়ার্ন পিএসজির হাফে এগ্রেসিভ প্রেসিং করে এবং দ্বিতীয় গোলটি আদায় করে নেয়।

থিয়াগো সিলভা এদিনও লেওয়ানডস্কিকে ছায়ার মতো অনুসরন করেন, কিন্তু এদিন বায়ার্নের প্ল্যানে লেওয়ানডস্কিই একমাত্র টার্গেট ম্যান ছিলেন না! বায়ার্নের সেকেন্ড গোলে লেওয়ানডস্কি সিলভা সহ আরো একজন ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে ড্র্যাগ করেন। এর ফলে শ্যাডো স্ট্রাইকারের মতন মিডফিল্ড থেকে বক্সে ঢুকে যাওয়া টলিসো ছিলেন পুরোপুরি ফ্রী! দুর্দান্ত হেড থেকে ব্যাভারিয়ানদের ২-০ তে এগিয়েও দেন টলিসো।

বিরতির পর উনাই এমরির পিএসজি এগ্রেসিভ হাইপ্রেসিং বাদ দিয়ে বায়ার্নকে উপরে উঠে আসার স্পেস দিতে থাকে যাতে করে বায়ার্নের হাইলাইন ডিফেন্সের পিছন দিয়ে এটাকে উঠা যায়। বায়ার্নের উপরে উঠে আসা এবং দুর্বল কাউন্টার প্রেসিং এর সুযোগে সেকেন্ড হাফে ভালো কয়েকটি কাউন্টার এটাক করে পিএসজি। যার একটিতে এম্বাপ্পের দুর্দান্ত ফিনিশিং এ পিএসজি খেলায় ফিরে।

রিবেরির বদলে মুলার নামেন এবং ম্যাচসেরা কোমান চলে যান লেফট উইঙ্গে। কাউন্টার এটাকে সেই লেফট উইং দিয়েই আবারো এটাকে উঠে বায়ার্ন এবং দানি আলভেজকে বিট করে দুর্দান্ত সলো রানে পিএসজির ডিফেন্সে ঢুকে পরেন কোমান। লেওয়ানডস্কি ফরোয়ার্ড রান দিয়ে সিলভাসহ আরেক জন ডিফেন্ডারকে নিজের সাথে আরো সামনে নিয়ে যান। এর ফলে শ্যাডো স্ট্রাইকারের মতো বক্সে ঢুকা টলিসো আবারো স্পেস পান এবং বায়ার্নকে ৩-১ এ এগিয়ে দেন।

ডীপ ডিফেন্স করে ডিফেন্সের পিছনে নেইমার-এম্বাপ্পেদের স্পেস না দেওয়া, কাউন্টার এটাকে পিএসজির ডিফেন্সের রাইট সাইড এক্সপ্লয়েট করা, লেওয়ানডস্কির কড়া মার্কিং এর বিপরীতে শ্যাডো স্ট্রাইকারের ইউজ আনচেলত্তির বায়ার্নের সাথে হেইনক্সের বায়ার্নের ডিফারেন্স ছিল এই ম্যাচে। তবে এই বায়ার্ন ২০১৩ এর বায়ার্নের সাথে তুলনা দেওয়ার মতো না এখনো কারন ব্যাভারিয়ানরা কাউন্টার প্রেসিং এ উইক ছিল, যার ফলে পিএসজি বেশ কয়েকবার কাউন্টার এটাকে উঠতে পারসে। সেন্টার অফ দ্যা ফিল্ডে একজন হোল্ডিং মিডফিল্ডারের অভাব ছিল কালকে। অবশ্য থিয়াগো ব্যাক করলে এই সমস্যা থাকবে না। কিন্তু একজন ভালো ডেস্ট্রয়ার প্লাস ভালোমানের কাউন্টার প্রেসিং অবশ্যই লাগবে বায়ার্নের।