অনন্য উচ্চতার মহানায়ক কালো মানিক

পেলের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার!

উইলিয়াম শেক্সপিয়ারকে বলা হয় বিশ্বের সেরা ট্র্যাজিক গল্পের লেখক। নিজের কলমের গাথুঁনিতে কি করেননি তিনি? রোমিও জুলিয়েটের পর্যন্ত নির্মম পরিণতি ঘটিয়েছেন। এতো বড় ট্র্যাজেডির লেখক কি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন তার লেখা ট্র্যাজিক গল্প গুলো থেকেও বড় ট্র্যাজেডির রচনা হবে মারাকানা নামক এক ফুটবল মাঠে। হ্যা,  ঠিকই শুনেছেন মারাকানার মাঠে সেদিন রচনা হয়েছিল এক নির্মম ট্রাজেডি গল্পের। সেদিন মারাকানার মাঠে উৎসব মুখর ব্রাজিলিয়ান জনগন গিয়েছিল তাদের প্রিয় দলের বিশ্বজয় দেখতে। বিশেষ টি- শার্ট আর বিজয় মিছিল নিয়ে তৈরি ছিল ব্রাজিলিয়ান জনগন। কিন্তু বিধিবাম খেলা শেষে হবার এগারো মিনিট আগে উরুগুয়ের খেলোয়ার ঘিঘিয়া যখন গোল করেন, তখন স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো মারাকানা। ম্যাচটিতে যখন ব্রাজিল ২-১ ব্যবধানে পরাজয় বরণ করল তখন মারাকানায় নেমে এল শ্মশানের মত নীরবতা। মারাকানায় খেলা দেখতে আসা প্রায় ২ লাখ মানুষ যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। চোখের সামনে প্রিয় দলের পরাজয় সহ্য করতে পারলেননা অনেক ব্রাজিলিয়ান। তাই  খেলা দেখতে আসা অনেক ব্রাজিলিয়ান

মারাকানার ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্বহত্যা করেন। তারা এ ঘটনায় এতটায় কষ্ট  পেয়েছিলো  ও বাকরুদ্ধ হয়েছিল যে পর দিন নাকি প্রায় প্রতিটি ব্রাজিলিয়ানদের ঘরের দরজা, জানালা বন্ধ ছিল। দরজা বন্ধ করে ঘরের ভিতর অঝোরে কেঁদেছেন তারা। সেই রকম একটা ছোট্ট ঘরে রামোস নামক এক ব্যাক্তি কেঁদেই চলেছেন।তার কান্না যেন শেষই হচ্ছে না। তার পাশে বসা ছিল তার ছোট্ট ছেলে। ছেলেটি বুঝতে পারছে না তার বাবা কি কারনে কাঁদছেন। তাই বাবার কাছে গিয়ে ছোট্ট ছেলেটি প্রশ্ন করল ‘কি হয়েছে বাবা’?

বাবা জবাব দিল “ব্রাজিল হেরে গেছে বিশ্বকাপে”। ছোট্ট সেই ছেলেটি তার বাবাকে আশ্বস্ত করলেন কেঁদো না বাবা কথা দিচ্ছি আমি একদিন ব্রাজিল কে বিশ্বকাপ এনে দিব। সেদিন উরুগুয়ের কাছে ব্রাজিলের হারের পর নিজের বাবাকে কাঁদতে দেখে এক কিশোর ফুটবলকে তাঁর ধ্যানজ্ঞান বানিয়ে ফেলেছিল। আমার আজকের আলোচনার বিষয় সেই ছোট্ট ছেলেটি। তার সম্পর্কে জানতে হলে যে একটু পিছনে যেতে হবে। চলুন একটু পিছন থেকে ঘুরে আসা যাক।

২৩ অক্টোবর ১৯৪০ সালে ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয নামক স্থানে জন্মগ্রহন করেন এক শিশু। বিখ্যাত আমেরিকান “উদ্ভাবক “থমাস এডিসনের” নামে তার নাম রাখা হয় ‘এডসন ‘(পুর্তুগীজ ভাষায় এডিসন কে এডসন বলা হয়)। সেদিন কি তার বাবা-মা জানত বিখ্যাত ব্যাক্তির নাম অনুসারে নাম রাখা তাদের ছেলে ও একদিন বিশ্ববিখ্যাত হবে, নাম লেখাবে অমরত্বের পাতায়। পারিবারিক ভাবে তাকে অবশ্য “ডিকো” বলে ডাকা হতো। আর পেলে নামটি দেয় তার বন্ধুরা। তার ছোট বেলার গল্পটাও ছিল আট – দশটা ক্লাসিক ল্যাটিন খেলোয়ারের শুরুর গল্পের মত। শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যে। দু বেলা পেটের খোরাক যোগাতেই কষ্ট হত। খেলার জন্য যে বল কিনবে, সে তো ছিল অলীক কল্পনা। তাইতো মোজার ভিতর কাপড় – পেপার অাবার কখনও জাম্বুরা দিয়ে ফুটবলের কাজ চালিয়ে দিতেন। গলির রাস্তায় খেলতে খেলতে তার প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে।

তার বয়স যখন ১৫ বছর তখন তিনি ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসে যোগদান করেন। সান্তোসে যোগদান করার পর পরই ব্রাজিলিয়ান
মিডিয়াগুলো তাকে ভবিষ্যত সুপারস্টার হিসাবে প্রচারণা চালাতে থাকে। তার বয়স যখন ষোল তখন তিনি সান্তোসের মূল দলে জায়গা পান। প্রথম সিজনেই তিনি সান্তোসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ১৯৫৮ সালে পেলে সান্তোসের হয়ে প্রথম শিরোপা জয় লাভ করেন। তার পর একে একে সান্তোসের হয়ে জিতেন সম্ভাব্য সকল ট্রফি। পেলে যখন সান্তোসের হয়ে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন, সান্তোস তখন আহামরি কোন ক্লাব ছিল না। কিন্তু পেলে যোগদান করার পর সান্তোসের চেহারা ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকল। সান্তোস তখন আস্তে আস্তে ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসাবে গড়ে উঠতে থাকে। পেলে সান্তোসে যোগদানের পূর্বে সান্তোস কোন সময় কোপা লিবার্তোদোরেস জয় লাভ করেনি। পেলে সান্তোস কে নিয়ে দুইবার কোপা লিবার্তোদোরেস জয় লাভ করেন। একটা পর্যায়ে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো পেলের সান্তোসের কাছে নাকানি চুবানি খেত থাকল হরহামেশা।

সে সময়কার ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (বর্তমানে যা ক্লাব ওয়াল্ডকাপ নামে পরিচিত) গুলোর রেজাল্ট দেখলে পরিস্কার হওয়া যায়, পেলের সান্তোস তখন কতটা শক্তিশালী দল হয়ে উঠেছিল। পেলে সান্তোসের হয়ে তার উনিশ বছরে ক্যারিয়ারে ৬৫৬ টি অফিসিয়াল ম্যাচে ৬৪২ গোল করেন। এছাড়াও সান্তোসের হয়ে ২৩ টি শিরোপা জয় লাভ করেন। একটা মাঝারি মানের দলকে তিনি নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। (উল্লেখ্য যে পেলে আসার আগে সান্তোস কোন সময় কোপা লিবার্তোদোরেস ও ইন্টারকন্টিনেনটাল কাপ জিতে নাই এবং পেলে অবসরের পর প্রায় চল্লিশ বছর লেগে যায় কোপা লিবার্তোদোরেস শিরোপা জিততে, যদিও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ আর জিতেনি )। বিংশ শতাব্দির সেরা ক্লাব নির্বাচনের সময় ফিফা পেলের সান্তোস কে রেখেছেন পাঁচ নাম্বারে। পেলে তার পুরো ক্যারিয়ার প্রায় সান্তোসেই খেলেন।

পেলে কে দলে নিতে রিয়াল, ইউনাইটেড, জুভেন্টাসের মত ক্লাবগুলো অনেক চেষ্টা করে, কিন্তু ১৯৬১ সালে ব্রাজিলের সরকার পেলেকে জাতীয় রত্ন হিসাবে ঘোষনা দেন। যার কারনে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো তাকে দলে ভেড়াতে পারেনি। সান্তোস থেকে অবসর নেওয়ার পর পেলে কিছুদিন আমেরিকান ক্লাব নিউইয়র্ক কসমসের হয়ে খেলেন। ১৯৭৭ সালের আক্টোবর মাসের এক তারিখ পেলে তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলেন। সে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় সান্তোস ও নিউইয়র্ক কসমসের মধ্যে। পেলে দু’দলের হয়ে অর্ধেক অর্ধেক খেলেন। সে ম্যাচটি দেখতে মাঠে আসেন পেলের বাবা ও স্ত্রী এবং কিংবদন্তী বক্সার মুহাম্মদ আলী ও ফুটবলার ববি মুর। সেই ম্যাচে দর্শকরা করতালির মাধ্যমে বিদায় দেয় ফুটবলের এই সম্রাট কে।

চির প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার সাথে এক ম্যাচের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের হয়ে তার পথ চলা শুরু হয়। দেখতে দেখতে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ চলে আসে। আর পেলে ও ডাক পেয়ে যায় বিশ্বকাপ একাদশে। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি পেলের। গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে তখনকার সময়ে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন পেলে এবং ভাভার গোলে এসিস্ট করেন। ওয়েলসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে গোল করেন। সেমি ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড হিসেবে হ্যাটট্রিক করেন। ২৯ শে জুন পেলে ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে খেলতে নামেন এবং ২ গোল করেন।

টুর্নামেন্ট শেষে চার ম্যাচে ৬ গোল করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা তরুন খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং ব্রাজিলকে এনে দেন তাদের স্বপ্নের সেই বিশ্বকাপ ট্রফি। পেলে তার বাবাকে দেয়া কথা রেখেছিলেন। ব্রাজিলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছেন। সেই যে পথ চলা শুরু করেছেন আর পিছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। সামনের পথ গুলোতে রচনা করেছেন শুধু ইতিহাস আর ইতিহাস। নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে ইনজুরির কারনে খেলা হয়ে উঠে নি পরের বিশ্বকাপেও ভাগ্য সহায় ছিল না। ১৯৬৬ এর বিশ্বকাপে মাঝপর্যায়ে ইনজুরিতে পরেন। তাই সেবারের বিশ্বকাপে তেমন কিছু করতে পারেন নি। ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলে দেখিয়েছেন তিনি এই গোলাকার বলটিকে দিয়ে কি করতে পারেন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল মুখোমুখি হয় চেকস্লোভাকিয়ার। চেকস্লোভাকিয়ার সাথে গোল করার মাধ্যমে পেলে সেই বিশ্বকাপের গোলের খাতা খুলেন।

পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জায়েরজিনহো ক্রসকে অসাধারন হেডে গোলবারে প্রায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল পেলে, বলটা শুধু মাত্র জালে স্পর্শ করা আর গোল উদযাপন করা বাকী ছিলো। কোথার থেকে যেনো গর্ডন উড়ে এসে বলটিকে ডান হাত দিয়ে দিয়ে বারের বাহিরে পাঠিয়ে দিলো তা আল্লাহই জানে। একদম সম্পুর্ন হয়ে যাওয়া গোলটিকে গর্ডন সেদিন যেভাবে সেইভ করেছিলো তা ছিলো আসলেই দর্শনীয়। গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে রোমানিয়ার সাথে পেলে জোড়া গোল করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে পেরুর সাথে ম্যাচে পেলে একটি এসিস্ট করেন। সেমিফাইনালে উরুগুয়ের সাথে পেলে কোন গোল না পেলেও তার পারফর্মেন্স ছিল অসাধারণ। ফাইনালে ইতালীর মুখোমুখি হয় ব্রাজিল। ম্যাচের আগে সমীকরণ এমন দাঁড়ায় যেই দল জিতবে সেই দল জুলে রিমে বিশ্বকাপটি একেবারে নিজেদের করে নিয়ে নিবে।

কারন তখন নিয়ম ছিলো যে দল ৩ বার বিশ্বকাপ জিতবে সে দল একেবারে বিশ্বকাপ নিয়ে নিবে। আর ব্রাজিল ইতালী দু দলই ইতিমধ্যে দুবার করে বিশ্বকাপ জয় করেন। খেলা শুরুর ১৮ মিনিটে লেফট উইং থেকে ব্রিত্তো থ্রো দেয় রিভেলিনোকে, রিভেলিনোর ক্লিয়ার ক্রস ইতালীর একেবারে বারের একটু সামনে পড়লে উড়ন্ত বলকে এক অসাধারণ হেডে জালে জড়ান পেলে।কিছুক্ষণ পর জরজিনহোর গোলে চমৎকার একটি এসিস্ট ও করেন পেলে। পুরো ম্যাচে ইতালীর ডিফেন্স কে একাই নাজেহাল করে ছাড়েন পেলে। আর ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের হাতে উঠে বিশ্বকাপের সোনালি সেই ট্রফি। আর টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসাবে পেলে জিতেন গোল্ডেন বল। ১৯৭০ বিশ্বকাপের পর পেলে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। পেলে ব্রাজিলের হয়ে ৯২ ম্যাচে ৭৭ গোল করে স্থান করে নেন ব্রাজিলের হয়ে অল টাইম লিডিং গোল স্কোরারের খেতাব।

যুগে যুগে অনেক লিজেন্ডারি প্লেয়ার, কোচ, সাংবাদিক, ফুটবল বোদ্ধারা পেলে কে নিয়ে করেছেন অসংখ্য মন্তব্য। তাদের এ সকল মন্তব্য থেকে স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে ফুটবলের জন্য পেলে কি ছিল। পেলে সম্পর্কে তেমনি কিছু কালজয়ী উক্তি নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ

★ জাস্ট ফন্টেইন : “পেলেকে খেলতে দেখার পর মনে হয়েছিলো আমার খেলা ছেডে দেওয়া উচিত”

★ স্যার ববি চার্লটন : “মাঝেমধ্যে আমার কেন জানি মনে হয় ফুটবল খেলাটির জন্ম হয়েছিলো ওই জাদুকর (পেলে) খেলোয়ারটির জন্যই”

★ ইয়োহান ক্রুইফ : “পেলে একমাএ খেলোয়ার যিনি যুক্তিবোধের দেয়াল ডিঙিয়ে গিয়েছিলেন”

★ ফেরেস্কে পুসকাস : “ইতিহাসে সর্বকালে সেরা খেলোয়ারটির নাম ডি স্টেফানো। পেলেকে খেলোয়ার হিসেবে ধরছি
না। তিনি এইসবের উর্ধ্বে”

★ ইতালির ডিফেন্ডার তার্কিসিও বার্গনিচ : “ম্যাচের আগে নিজেকে এই বলে সাহস দিয়েছিলাম ‘ভয় কি সেও
তো রক্তমাংসেরই মানুষ’ কিন্তু ম্যাচের পর বুঝলাম আমার ধারণা ভুল ছিলো”

★ বেকেনবাউয়ার : পেলে সর্বকালের সেরা খেলোয়ার। তিনি ম্যারাডোনা, ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি থেকে এগিয়ে। তার সাথে অন্য কারো তুলনা চলে না।

★ কস্তা পেরেইরা (বেনফিকা গোলকিপার) : ‘আমি এসেছিলাম একজন সেরা মানুষকে থামানোর আশা নিয়ে
কিন্তু ফিরে গিয়েছিলাম এই বিশ্বাসের সাথে যে আমি তার দ্বারা অকৃতকার্য হয়েছি যে আমাদের সকলের মত একই গ্রহে
জন্মায়নি “

★ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো : “পেলে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়”

★ রোনাল্ড রিগ্যান (আমেরিকার প্রেসিডেন্ট) : “আমি রোনাল্ড রিগ্যান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আপনার পরিচয় দেবার দরকার নাই। কারণ সবাই জানে পেলে কে। “

১৯৯১ সালে ফিফা ‘প্লেয়ার অব দ্যা ইয়ার’ পুরস্কার চালু করেন। এর কিছুদিন পর ফিফা চিন্তা করল বিংশ শতাব্দির সেরা খেলোয়ারটিকে পুরস্কৃত করবেন এবং সেই এওয়ার্ড টার নাম দেন ‘ফিফা প্লেয়ার অব দ্যা সেঞ্চুরি’। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন সেরা প্লেয়ার বাছাই করবেন তিনটি পদ্ধতির সমন্বয়েঃ

১) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

২)অফিসিয়াল ম্যাগাজিন

৩) গ্র্যান্ড জুরি বোর্ডের মাধ্যমে

অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে ভোটিং টা হয়েছিল সেখানে পেলেকে পিছনে ফেলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু ফিফা ম্যাগাজিন ও গ্রেন্ড জুরির ভোটে পেলে পিছনে ফেলেন ম্যারাডোনা কে। সেখানে পেলে পায় ৭২.৭৫% ভোট।তাই ফিফা পেলে ও ম্যারাডোনা দুই জনকে যৌথভাবে প্লেয়ার অব দ্যা সেঞ্চুরি ঘোষণা করে। এরপর IFFHS একটি ভোটিংয়ের আয়োজন করে। সেই ভোটিং পোলেও ছিল পেলের আধিপত্য। সেখানে পেলে প্রায় ১৭০৫ পয়েন্ট পায়, যেটা তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রুইফ থেকে প্রায় ৪০০ পয়েন্ট বেশি।এছাড়াও ১৯৯৯ সালে বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাঁকে নির্বাচিত করেছে গত শতকের সেরা ক্রীড়াব্যক্তিত্ব হিসেবে, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির বিবেচনায়ও একই স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। ফ্রান্সের বিখ্যাত ফুটবল সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবলের গোল্ডেন বলজয়ী ফুটবলারদের ভোটেও পেলেই গত শতকের সেরা ফুটবলার, ইউনিসেফ আর বিবিসির জরিপেও তাই।

ফ্রান্স ফুটবল আগে ব্যালন শুধু ইউরোপিয়ান প্লেয়ারদের দিতো। যার কারনে পেলে বা অন্য কোন ল্যাটিন আমেরিকান প্লেয়ারের পক্ষে ব্যালন পাওয়া সম্ভব ছিলনা। কিন্তু ফ্রান্স ফুটবল কিছুদিন আগে নিয়মটি পরিবর্তন করেন, পূর্ববর্তি সকল খেলোয়াড়দেরকেও বিবেচনায় এনে নতুন করে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয় । এখানে পূর্ববর্তী ৩৯টি ব্যালন ডি অর-এ ১২টি পরিবর্তন হয়। ১৯৫৮, ১৯৫৯, ১৯৬০, ১৯৬১, ১৯৬৩, ১৯৬৪ আর ১৯৭০ এর ব্যালন ডিঅর জয়ী ঘোষণা করা হয় পেলেকে। তবে সম্মানের জন্য আগের খেলোয়াড়দের নামও রাখা হয়। এছাড়াও ২০১৩ সালে পেলেকে তার ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি এবং অর্জন সমূহের জন্য দেয়া হয় FIFA Ballon d’Or Prix d’Honneur.

পেলে কে? কি ছিল পেলের মহত্ব। কয়েকটা উদাহারন দেই তাহলে স্পষ্ট হবেন। সালটা ১৯৬৭ গৃহযুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে পুরো নাইজেরিয়াতে। একদিন তারা খবর পেল ফুটবল সম্রাট পেলে আসছে। তখন গৃহযুদ্ধরত দুই উপদল ৪৮ ঘন্টার যুদ্ধ বিরতির ঘোষনা দিয়ে পেলের খেলা দেখতে সম্মত হয়।

তাই  পেলে সম্পর্কে একটা কথা বলতে হয় তিনি এমনই একজন খেলোয়ার যিনি যুদ্ধবোধের দেয়াল ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। তিনি যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই পেয়েছেন দর্শকদের ভালবাসা। আর এই ভালবাসা তিনি এমনিতেই পান নি, তিনি এই ভালবাসা অর্জন করেছেন তার শৈল্পিক খেলার মাধ্যমে। পেলে যখন নিউইয়র্ক কসমসের হয়ে খেলতেন  তখন নাকি বিপক্ষ দলের সব খেলোয়াড় তার জার্সি নিতে চাইতো।

এই কারণে ক্লাবকে তার ২৫-৩০টি জার্সি সাথে করে নিতে হতো।   নাহলে মাঠ ছেড়ে বের হওয়াটা নাকি কষ্টকর ছিল। উপরোক্ত এই উদাহারন গুলোর পরও যদি পেলের মহত্ব বুঝতে কষ্ট হয় তাহলে আরেকটা উদাহারন দেই , পেলে যখন হোয়াইট হাউজে যান তখন পেলে কে দেখা মাত্র তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বলেছিল “আমি রোনাল্ড রিগান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আপনার পরিচয় দেবার দরকার নেই সবাই জানে পেলে কে ! “

পেলে কে একবার তার অর্জন নিয়ে বলতে বলা হয়েছিল।  জবাবে পেলে বলেছিল “ সফলতা কোন দুর্ঘটনা না। এটা পরিশ্রম, ধৈর্য্য, শিক্ষা, ত্যাগ এবং সবথেকে বেশি যেটা দরকার সেটা হল খেলাটার জন্য ভালোবাসা”। আসলেই পরিশ্রম, ধৈর্য ও ভালবাসার মাধ্যমে পেলে পৌছে গেছেন ফুটবলের এমন একটা জায়গায়। যে জায়গাটা অন্য ফুটবলারদের নিকট কেবল স্বপ্নের মত। এখন পর্যন্ত খেলা ফুটবলারদের মধ্যে পেলেকে বেশিরভাগ ফুটবল বোদ্ধারা এগিয়ে রাখেন। ভবিষ্যতে কেউ তার এই আসনটা দখল করতে পারবে কিনা তা বলা কঠিন, সে সম্পর্কে আমরা শুধু অনুমানই করতে পারি। পেলের মত প্লেয়ার নিয়ে লেখতে বসলে তা শেষ করা কঠিন। এই লেখাটি পেলের বিশাল ক্যারিয়ার থেকে অনেকটা সিন্ধু থেকে বিন্দু তুলে আনার মত। আজকের মত এখানেই শেষ করছি। আর জন্মদিনে অনেক অনেক শুভকামনা রইল “The Black Pearl”!