একজন জর্জ কোটান এবং বাংলাদেশের ফুটবল

জর্জ কোটানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ২০১৬ সালে। এর আগেও বাংলাদেশে উনি এসেছেন তবে তখন আমি বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে বলতে গেলে কিছুই জানতাম না এবং ফুটবলের সাথে কোনভাবেই জড়িত ছিলাম না। হয়ত বয়সটা কম ছিলো তাই। তবে এই ভদ্রলোকের সাফল্য গাথার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। একজন বাংলাদেশি হিসেবে সাফ জয়ের সঙ্গে পরিচয় না থাকাটা অস্বাভাবিক।

তার সাথে যেদিন দেখা সেদিন ক্লাবে যেয়ে দেখি উনি বুটের ফিতা বাঁধছেন। ছুটির দিনে বুট পরে কি করবেন কে জানে? তার কাছ থেকেই পরে জানলাম যে হকি দলের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে ক্লাব স্টাফদের নিয়ে ফুটসাল খেলবেন। এই বয়সে এসেও যে ধাঁরটা হারাননি সেটা তার পায়ের কারুকাজ দেখলেই বোঝা যায়।

খেলা শেষে হাপাতে হাপাতে একজন স্টাফকে বললেন দুইটা কফি দিয়ে যেতে। বেশ দীর্ঘ একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তার। এর আগে যতজন কোচের সাক্ষাৎকার নিয়েছি তাদের সবার চেয়ে কোটান ছিলেন আলাদা। গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে তার কথা শুনতে ভালোই লাগছিলো যদিও কফিতে চিনি একটু কম হয়েছিলো। তবে সেটাও তখন ভালো লেগেছে। একজন ইউরোপিয়ান মানুষকে মুগ্ধতার সাথে ভাঙা মগে কফি খেতে দেখে অন্তত কম্পলেইন করতে ইচ্ছে হয়না।

অনেক কোচেরাই এই দেশে এসেছেন। খাওয়া দাওয়ায় ঝাঁজ তাদের বিরক্ত করেছে। কেউ রেগে গিয়েছেন ঘরে তেলাপোকা দেখে। ছবিও তুলেছেন তারা সেসবের। খেলোয়াড়দের বিকেএসপিতে ফেলেও আসতে চেয়েছেন তারা। আর সেখানে কোটান ভাঙা মগে কফি খান খুব আনন্দের সাথে। সকাল সকাল ক্লাবে চলে আসেন ফুটবলারদের কাছে পেতে। একটা পরিবারের বাবা যেমন মাথার উপর ছাতা হয়ে থাকে কোটান ঠিক সেভাবে একটা দলের মাথার উপর ছাতা।

মানুষজন কনফিডেন্সিয়াল কথা বলতে ভালোবাসে। লুকোচুরি করে নিজেকে বড় দেখায়। সেক্ষেত্রে কোটান আলাদা, বেশ প্র‍্যাক্টিকাল। এই দেশের ফুটবলকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সমস্যাগুলো তার জানা, সমাধানটাও। তবে শুধু উনি নন আরো অনেকেই সমাধানটা জানেন তবে কাজ কেউ করে না। খোলাখুলি ভাবেই ধুয়ে দেন ফেডারেশনকে। হতাশার কথা বলেন ২০০৩ সাফ নিয়ে। হতাশ হবেন না বা কেনো? যে জায়গায় তিনি রেখে গিয়েছিলেন সেখান থেকে উন্নতি তো দূরের কথা বাংলাদেশ উলটো করেছে অবনতি।

আবাহনী ক্লাবে যে কয়দিন ছিলেন দাড় করিয়ে দিয়েছিলেন একটা প্রোপার স্ট্রাকচার, বর্তমান কোচ এক হিসেবে তারই ব্লু প্রিন্টে খেলায়। আবাহনীর প্র‍্যাক্টিস গ্রাউন্ডটা একসময় ছিলো জঘন্য অবস্থায়, খেলোয়াড়েরা প্রতিনিয়ত পড়তো ইঞ্জুরিতে। উদ্দ্যেগ নিয়ে সেই মাঠকেই বানিয়েছেন বিশ্বমানের। এর পাশ দিয়ে কেউ হেটে গেলে দুইবার ফিরে তাকায়। মাঠের ঘাসটাও অনেকসময় কাটতেন নিজ হাতে। শুনেছি একবার একজন এই মাঠে বসে থাকতে দেখে উঠিয়ে নিজ পকেট থেকে টাকা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ৩২ নম্বর ব্রিজে যেয়ে বাদাম খেতে, এই মাঠ আড্ডা দেওয়ার জায়গা না। ডিসিপ্লিন নিয়েও তার অবস্থান ছিলো শক্ত। তবে সেটা ঠিক একজন অভিভাবকের মতন। তাই তো কড়া শাসনের সত্বেও ছিলেন খেলোয়াড়দের ভালোবাসার মানুষ। এই লোকের ইন্টেলিজেন্সের ফলটাও ঢাকা আবাহনী পেয়েছিলো বেশ ভালোভাবে, জিতেছিলো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ তাও আবার অপরাজেয়ভাবে।

সাফল্য পাওয়া সত্বেও চলে গিয়েছেন এই দেশ ছেড়ে। ক্লাব থেকে খুব করে বলা হয়েছিলো থেকে যেতে কিন্তু দেশের এমন জঘন্য অবকাঠামো সম্ভবত তার ভালো লাগেনা। কথায় কথায় এই বিষয়ে সহজ স্বীকারোক্তিও করেছেন। সে হিসেবে বলাই যায় যে এই অবকাঠামোর অভাবে আমরা খালি নিজেদের জৌলুশ হারাইনি হারিয়েছি একজন অভিভাবককেও।