একজন ডিক্টেটর নাকি সিস্টেমের কারাগারে বন্দি সৈনিক?

শুভ জন্মদিন কাজী সালাউদ্দিন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য, দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।

বাংলাদেশ ফুটবলের অবিসংবাদিত এই লিজেন্ডারী খেলোয়াড়টি ফেডারেশনের দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় আট বছর ধরে। এই সময়ে বাংলাদেশ ফুটবলে দৃশ্যত কোন উন্নয়ন হয়নি, অবনতিটাই বরং দৃশ্যমান। ফিফা র‍্যাংকিং এ বেশ কয়েক ধাপ অবনতি শেষে তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারটি ফেডারেশনের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েও যখন এই অবস্থার তৈরী হয়, তখন আসলে হতাশ হওয়া ছাড়া কিছু করার থাকেনা এবং এর দায় তাঁকে কিছুটা হলেও নিতে হবে, কিন্তু কতটা?

একটা সহজ প্রশ্ন করি? এই মুহুর্তে যে যেখানে বসে আছেন, বাংলাদেশ ফুটবলের মান উন্নয়নের জন্য কয়েকটি প্রস্তাবনা ভাবুন। যেগুলো করলে ফুটবলের মান উন্নয়ন হবে বলে আপনি আশাবাদী। আমি কয়েকটি পয়েন্ট লিখছি, যার একটি আরেকটির সাথে গভীরভাবে জড়িত।

১) তৃণমূল পর্যায় থেকে ফুটবল প্রতিভা অন্বেষণ এবং এদের নিয়ে কাজ করা।
২) ক্লাব ফুটবলকে ঢেলে সাজানো।

আমি আমার স্বল্পবুদ্ধিতে এর চেয়ে বেশী কিছু করার দেখিনা। ম্যানিয়াক্সের জন্মের এক বছরের মাথায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে দেশের ফুটবল নিয়ে কিছু করা যায় কিনা দেখি। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে আমরা ঢাকায় অবস্থিত প্রায় প্রতিটা ক্লাবেই কয়েকদফা গিয়েছি। দেশের ইতিহাসের লিজেন্ডারী ফুটবলারদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তাদের মতামত শুনেছি, সাম্প্রতিক সময়ে যারা খেলছেন, তাদের কথাও শুনেছি, তাদের অনেকেই সেই সুবাধে আমাদের পরিচিত এবং আমাদের ফেসবুক গ্রুপেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমি উপরের দুটা পয়েন্টের ক্ষানিকটা মেলবন্ধন করার চেষ্টা করছি।

তৃণমূল পর্যায় থেকে ফুটবল নিয়ে কাজ করা নিয়ে বাংলাদেশ দলের সাবেক লিজেন্ডারী ফুটবলার কায়সার হামিদকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, বেশ কয়েকদফা ফেডারেশন উদ্যোগ নিয়েছিলো, উনি সহ আরো কয়েকজন মিলে কিছুদিন কাজও করেছেন, তারপর তাদের নিয়ে লম্বা সময় কাজ করার জন্য যে পরিমাণ অর্থায়নের প্রয়োজন হয় তার জোগান দিতে না পারায় একটা সময় প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যায়।

একটা সহজ প্রশ্ন করি, কয়টা দেশের ফুটবল ফেডারেশন ফুটবল একাডেমীর দায় দায়িত্ব নিয়ে থাকে? ফুটবলের এত খোঁজ রাখেন, এটাও জানেন নিশ্চয়ই, একাডেমীগুলো বাণিজ্যিক অর্থাৎ ক্লাব ফুটবলের আওতাধীন। আয়াক্স, লা মাসিয়া কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড স্কুলের দায়িত্ব নেদারল্যান্ড, স্পেন কিংবা ইংল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশনের নয়। আমাদের কয়টা ক্লাবের একাডেমী আছে?

ক্লাব ফুটবলকে ঢেলে সাজাতে গেলে আমার মাথায় প্রথম যে ব্যাপারটি আসে তা হচ্ছে, আগে ক্যালেন্ডারটা সাজান। ফুটবল উন্নয়নের অর্থাৎ জাতীয় দলের কাছে পারফরম্যান্স চাইলে সারা বছর অর্থাৎ বছরের নয় মাস অন্তত মাঠে খেলতে হবে।

সেটা কি হচ্ছে? সারা দুনিয়াতে লিগ ফুটবল ম্যাচগুলো হয় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। আর আমাদের এখানে প্রতিদিনই খেলা হয়, তিন মাসে নয়মাসের খেলা শেষ করে দেয়া হয়। শুরুর দিকে আমাদের আগ্রহ থাকে, ম্যাচ থ্রেড দেই, মাঠে যাবার চেস্টা করি। কিন্তু নিজের কাজ ফেলে প্রতিদিন তো আর ভালো লাগেনা, ফলাফল? মাঠে দর্শক নেই, রেভিনিউ নেই, আয় নেই, বাফুফের অনুদানই অর্থায়নের একমাত্র সম্বল। ফুটবলারদের উপর দিয়েও যায় ধকল। ইনজুরিতে পড়ে, আর তারা যে ধরনের সুযোগ সুবিধা নিয়ে খেলে সে ব্যাপারে একটু পড়েই বলছি। আসেন ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে দিয়ে আগে কাজী সালাউদ্দিনকে একটা গালি দিয়ে নেই আগে, পরে বাকীটা পড়ি।

বাফুফে কি চাইলেই পেশাদার লিগের ক্যালেন্ডারটাকে তিন মাস থেকে টেনে নয় মাসে নিয়ে যেতে পারে? না পারেনা, কেনো পারেনা। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার দুই ঘন্টার মাথায় অন্তত চার পাঁচটা ক্লাব বেঁকে বসবে। আরে ভাই, সারা বছর কি খেলোয়াড়দের ক্যাম্প চালাবো নাকি? এতো টাকা কে দিবে? তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করেন।

সপ্তাহে কয়টা ম্যাচ খেলা যায় আর আমাদের ফুটবলাররা কয়টা খেলে? আর তারপর লীগ শেষ হবার পর কয় মাস শুয়ে বসে কাটায়? ফিটনেস ইস্যুটা তখন তো চলেই আসে, কয়টা ক্লাবের জিম আছে? কয়টা ক্লাবের অন্তত অনুশীলন করার উপযোগী মাঠ আছে? ক্যাম্প চলাকালীন সময়ে ফুটবলাররা কিভাবে থাকে?

আমরা গিয়ে দেখে এসেছি, শীর্ষস্থানীয় দুই তিনটা ক্লাব বাদে বেশীরভাগ ক্লাবেই ছোট্ট এক রুমে অন্তত চার-পাঁচজন থাকে। তাদের নিউট্রিশনের দায়িত্ব সারা বছর ফেডারেশন নিবেনা, ক্লাবগুলো নিবে। ফেডারেশন জাতীয় দলের ক্যাম্প চলাকালীন সময়ে, তা দেখবে? নিজের প্রিয় জাতীয় দলের দিকে তাকিয়ে দেখুন তাই হয়। নিপুদের হারিয়ে যাওয়ার দায় যতটা না কাজী সালাউদ্দিন তথা ফেডারেশনের তার চেয়ে ক্ষানিকটা বেশী ক্লাব ফুটবলের অপ-রাজনীতির। বয়স ভিত্তিক দলের ধাপগুলো অতিক্রম করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়, ফেডারশনের ক্যাম্পে নয়, ক্লাবের ক্যাম্পে, ক্লাবে খেলে। এ যেন আমরা বুঝেও বুঝিনা, চিল কান নিয়ে গেলো বলাতে আমরা চিলের পেছনে দৌড়াচ্ছি ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে।

বড় একটা ক্লাবের একটা বড় খেলোয়াড়ের পেট ব্যাথা, সেই ক্লাব খেলবেনা। আপনি কি করবেন? লেগে গেলো গোলমাল, শিডিউল এলোমেলো। যে কারনে টিভি রাইটস মেলেনা, প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর আগ্রহ নেই কেননা তাদের তো সে সময় খেলার জন্য বরাদ্দ থাকে অন্য কোন অনুষ্ঠান প্রস্তুত থাকেনা। ফলাফল, রেভিনিউ নেই, আয় নেই, অনুদানই ভরসা।

ফুটবল ফেডারেশন অনেকাংশেই জিম্মি ক্লাবগুলোর কাছে। কাজী সালাউদ্দিনের সবচেয়ে বড় ব্যার্থতা এই ডেডলক ভাঙ্গতে না পারা, এর জন্য তাকে যতটা দোষ দেয়া যায় তার চেয়ে ক্ষানিকটা বেশী দোষ আমি দিবো আমাদের দেশে হয়ে যাওয়া সিস্টেমকে।

প্রতিটা জেলা ক্রীড়া পরিষদে প্রতি বছরই টাকা যায়, সেই টাকা দিয়ে কয়টা জেলায় ফুটবল নিয়ে কাজ হয়? এই দায় কার? কাজী সালাউদ্দিনের একার?

জাতীয় দলের কোচ নিয়ে ঝামেলা যেন লেগেই আছে, এই দেশে কোচ আসে ফুল গলায় নিয়ে, যায় কখন টেরও পাওয়া যায়না। এই ব্যাপারগুলোর দায় বাফুফেকে কিছুটা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী দায়িত্বে কাউকে না কাউকে লাগবে, তার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে স্ট্রাকচার ঢেলে সাজাতে। সেজন্য ক্লাবগুলোর সাথে জড়িত প্রভাবশালীদেরও কিছুটা দায়িত্ব নিতে হবে। জাতীয় দল নির্বাচনে কিছুটা নয় বেশ ক্ষানিকটা স্বেচ্ছাচারিতা রয়েছে। এই দায়ও নিতে হবে ফেডারেশন এবং শীর্ষ স্থানীয় ক্লাবগুলোকে যৌথভাবে। কেনো? যারা জানে, তারা বুঝেছে। এর ব্যখ্যা দেয়া সম্ভব নয়।

আচ্ছা, ব্রাজিলিয়ান কোচ ডিডোর কথা মনে আছে? একবার জাতীয় দলকে নিয়ে ক্যাম্প করতে গেলেন কক্সবাজারে। সৈকতের বালুতে রানিং করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন কিছু শীর্ষ ফুটবলার। আমার বিশ্বাস তার ধারাবাহিকতায়, উনি বিদায়। দায়টা সবারই নিতে হবে নয় কি?

ফেডারেশনে বড় ক্লাবগুলোর কর্মকর্তারাও রয়েছেন। ফুটবলাররা আর্থিক অন্যায়ের সম্মুখীন হলে আমাদের দেশের আর দশটা পরিস্থিতির মতো এখানেও প্রভাব কাজ করে। এক ফুটবলারের মুখেই শুনেছি এই কথা।

বাফুফে বাংলাদেশ সরকারের টাকায় চলেনা। এটা সত্য কথা। আমার আপনার ট্যাক্সের টাকা বাফুফেতে যায়না, বাফুফের টাকা আসে ফিফা থেকে। যে কারনে সরকার বাফুফের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলে ফিফার নিষেধাজ্ঞা আসবে লম্বা সময়ের জন্য, এটা বোধহয় আমাদের মাথার কোন এক চিপা থেকে ডিলেট হয়ে গেছে।

বাফুফে সরকারের টাকায় চলুক বা না চলুক সমর্থকদের অনভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে বাধ্য। আজ সমর্থকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলেই, এই দশা। এটাও তাদের অনুধাবন করতে হবে। বাফুফের ফেসবুক পেইজ কে চালায় আমরা জানিনা। কাজী সালাউদ্দিন চালান না এটা তো নিশ্চিত। ফেসবুক পেইজে কি হয় সেটা তার জানারও কথা নয়। পেইজ এডমিনের নির্বুদ্ধিতার দায়টা পুরোটা কাজী সালাউদ্দিনকে দেয়া ঠিক হবেনা।

ফেসবুকে হ্যাশট্যাগ আন্দোলন চলছে ব্যাপক উৎসাহের সাথে। বিগ ব্যাং থিউরি অনুযায়ী, ইন এ ফাইন মর্নিং ব্যাপক এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা। এখানেও নিশ্চিতভাবে কোন একটা বিস্ফোরণের মাধ্যমে হ্যাশট্যাগ যুদ্ধের সূচনা হয়েছে। সেই বিষ্ফোরনের উৎস আমার জানা নাই। বাজারে ব্যাপক রিউমার, বাফুফের পেইজ এডমিনের নির্বুদ্ধিতায় অনেককে ব্যান করায় কাজী সালাউদ্দিন আউট আন্দোলনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেউ না কেউ তো প্রথম ভেবেছে এই কথা। অথবা একটা দেশপ্রেমিক গোষ্ঠীও থাকতে পারেন যারা ভাবেন কাজী সালাউদ্দিন আউট হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দেশ এগিয়ে যাবে তরতর করে।

হুজুগে বাঙ্গালী মেতে উঠলো হ্যাশট্যাগ আন্দোলনে। গত দুই বছরে প্রায় সবকটা ক্লাব, খেলোয়াড়, কোচদের সাথে নানা সময় কথা বলার সুবাধে আমার যতটুকু ধারণা হয়েছে দেশের ফুটবলের এই দুরবস্থার দায়ভার কাজী সালাউদিনের, তার অধীনস্ত বাফুফে কমিটির, ক্লাবগুলোর, জেলা ফুটবলের কর্তাদের, মিডিয়ার এবং সমর্থক হিসেবে আমাদেরও সমানভাবে।

কাজী সালাউদ্দিন হ্যাশট্যাগ এর বিষ্ফোরনের সূচনা যেখানে হয়েছে, সেখানে কারা আছে আমি জানিনা। তারা নিশ্চয়ই এই সমস্যাগুলোর কথা ভেবেছেন। কাজী সালাউদ্দিন আউট হলে ইন কে হবেন সেটাও ভেবে রেখেছেন? সমস্যা গুলোর সমাধান কিভাবে হবে তার নিশ্চয়ই একটা রূপরেখা উনারা তৈরী করেছেন?

নাকি?

নাকি, হুদাই একটা পেইজ থেকে ব্যান খাবার রাগে, ক্ষোভে হ্যাশট্যাগ ভাইরাল করে মানসিক প্রশান্তির চেষ্টা? যদি তাই হয়, তাহলে কানে হাত দিয়ে দেখেন কান আছে। চিলের পেছনে দৌড়ানোর দরকার নেই। সব জায়গায় কাজী সালাউদ্দিন হ্যাশট্যাগ দিয়ে আমরা আমাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারটিকে অপমান করা ছাড়া দেশের ফুটবলে আর কোন অবদান রাখতে পারছিনা।

দেশের ফুটবল এই ডেডলক ভেঙ্গে কিভাবে বের হবে আমার জানা নাই। সম্ভবত এইজন্য সকল পক্ষের, এর সাথে জড়িত যে চেইন রয়েছে তার প্রতিটা ব্যাক্তির সৎ হতে হবে না হয় সম্ভব না।

ভালো থাকুক দেশের ফুটবল। দায়টা পুরোটা কাজী সালাউদ্দিনকে না দিয়ে কিছুটা নিজের কাঁধেও নিন। আপনি, আমিও সেই সিস্টেমের অংশ। আর বাংলাদেশ ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় আর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সদস্যটিকে কিছুটা সম্মান দিন।

কিপ দ্যা বল রোলিং…