পর্তুগিজের ফুটবলের তৃতীয় সোনালী প্রজন্ম – এক নতুন তারকার আবির্ভাব

২০০৪ এর ইউরো টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরে, পর্তুগালের গোল্ডেন জেনারেশনের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই তাদের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানেন, শুধু লুইস ফিগো, নুনো গোমেজ থাকেন টিমে। ঐ সময়টায় পর্তুগাল টিমের জন্য সিলভার লাইন হয়ে দাঁড়ান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। উয়েফা ইউরো এর অল স্টার টিমে প্রথমবারেই জায়গা করে নেন রোনালদো। স্কলারিও নতুন করে আরও ২ বছরের জন্য চুক্তি করতে রাজি হন।

২০০৬ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে পর্তুগাল একটিও ম্যাচ না হেরে প্রথম হয়ে কোয়ালিফাইং রাউন্ড শেষ করে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যে শুধু এক টুর্নামেন্টের খেলোয়াড় হয়ে হারিয়ে যেতে আসেননি, সেটা সেবার খুব ভাল করেই বুঝিয়ে দিলেন। কোয়ালিফাইং রাউন্ডের প্রথম যে ৬টি ম্যাচ জিতেছিল পর্তুগাল, তার প্রতিটিতে গোল করেন মাত্র ১৯ বছর বয়সি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। পারফর্মেন্সটুকুর গুরুত্ব কতখানি সেটা যদি আপনি না বুঝেন, তবে এটা মনে করিয়ে দেয়া যায়, সব গ্রেট টিমেরই যখন একটা জেনারেশন শেষ হয়ে তরুন একটা জেনারেশন আসে, তখন অটোমেটিক হোঁচট খায়। আর দলটা যেখানে পর্তুগাল, যারা প্রতিটা মেজর টুর্নামেন্ট খেলার পরপরই এর আগে প্রতিবার লম্বা সময়ের জন্য হারিয়ে যেত, সেখানে এমন পারফর্মেন্স এতটাই ভাইটাল ছিল যে, এরপর থেকে আর তাদেরকে পিছনে তাকাতে হয়নি, সেই ধারাবাহিকতায় আজও প্রতিটা মেজর টুর্নামেন্টই খেলে আসতেছে পর্তুগাল, যেটা প্রথম কোন শিরোপা তো অবশ্যই, যেকোনো শিরোপা জয়ের জন্য অত্যাবশ্যক। আর সে কাজের অনেকটাই করে দেন ১৯ বছরের বিস্ময় বালক। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এমন পারফর্মেন্স জাতীয় দলে, আর তখনকার দলে সে কোন স্ট্রাইকারও ছিল না, একজন উইঙ্গার ছিল, যার পায়ে বল যাওয়া মাত্র প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ক্ষিপ্র গতির দৌড়ে ছিটকে ফেলে দলের জন্য অ্যাটাকের সূচনা করে দিত, তাকে আটকাতে গিয়ে টিমের অন্য প্লেয়াররা স্পেস পেয়ে যেত। তাই অন্য অনেকের মতো ২০০৪ সালেও ১৯ বছরের রোনালদো দলে কেবল নামমাত্রই ছিলেন না, ছিলেন দলের অন্যতম পারফর্মার।

২০০৬ বিশ্বকাপের সহজ গ্রুপ থেকে আরও সহজে সবগুলো ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যায় পর্তুগাল, নিজের বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচেই বিশ্বকাপে প্রথম গোল পেয়ে যায় ক্রিস্টিয়ানো। গোলের পরে সবার প্রথমেই তার কাছে গিয়ে উল্লাসে মেতে পরেন গোল্ডেন জেনারেশনের লাস্ট গোল্ডেন বয় লুইস ফিগো, টিমের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারিকে হয়ত তখনি দেখে ফেলেছিলেন তিনি ঐ ২১ বছরের বালকের মধ্যে।

গ্রুপ পর্ব সহজ হওয়ার খেসারত, নাকি ভাগ্য, যেটাই বলুন না কেন, বিশ্বকাপে এরপরের নকআউট ম্যাচগুলোতে একের পর এক কঠিন প্রতিপক্ষের সামনেই পরে পর্তুগাল। প্রতিপক্ষগুলোর নাম দেখুন, প্রথমে নেদারল্যান্ড, তারপর একে একে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি! রাউন্ড অফ সিক্সটিনে পর্তুগালের সাথে নেদারল্যান্ডের সেই ঐতিহাসিক কুখ্যাত ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়, যার নাম দেয়া হয় ব্যাটল অব নুরেমবার্গ। রেফারি ঐ ম্যাচে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের রেকর্ড ৪টি লাল কার্ড এবং ১৬টি হলুদ কার্ড দেখান দুই দলের খেলোয়াড়দের। ১-০ গোলে ম্যাচটি জিতে কোয়ার্টারে যায় পর্তুগাল। ইংল্যান্ডের সাথে ঐ ম্যাচটি নানা কারণেই আলোচিত, ম্যানইউ সতীর্থ রুনির কার্ভালহোকে ফাউলের পর রোনালদোর রেফারির কাছে গিয়ে কার্ডের আবেদন, রুনির ধাক্কা দিয়ে রনকে সরিয়ে দেয়া, রেফারির রুনিকে দেয়া লাল কার্ড, তারপর রোনালদোর সেই চোখ টিপ, সেটা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি পরে। গোলশূন্য ঐ ম্যাচে পরে টাইব্রেকারে ৩-১ এ ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ১৯৬৬ সালের পর আবারও প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের সেমিতে উঠে পর্তুগাল, প্রতিপক্ষ জিদানের ফ্রান্স। ঠিক ২০০০ সালের ইউরো এর মত। হিস্টোরি রিপিটস ইটসেলফ। আবারও জিদানের পেনাল্টি গোলেই কাঁদল পর্তুগাল, প্রথমার্ধের ঐ গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানদের কাছে ৩-১ গোলে হেরে ৪র্থ হয় পর্তুগাল। সান্ত্বনা হিসেবে নতুন ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ২ নম্বরে উঠে আসে পর্তুগিজরা।

২০০৪ ইউরো আর ২০০৬ বিশ্বকাপের সাফল্যের পর পর্তুগালকে ইউরো ২০০৮ এর মেজর কন্টেন্ডার হিসেবে ধরা হচ্ছিল। কিন্তু কোয়ালিফিকেশন এতটা সহজ ছিল না। স্কলারি ৩ ম্যাচের জন্য সাস্পেন্ড হন। গ্রুপে পোল্যান্ড থেকে ১ পয়েন্ট পিছনে থেকে ইউরোতে কোয়ালিফাই করে পর্তুগাল। জনপ্রিয় টিভি নেটওয়ার্ক ইএসপিএন পর্তুগিজ টিমকে ফিচার করে উয়েফা ২০০৮ ইউরো এর অ্যাড ক্যাম্পেইন চালায়। গ্রুপের প্রথম ম্যাচে তুর্কিদের ২-০ গোলে হারায় তারা, প্রথম আন্তর্জাতিক গোল স্কোর করে পেপে। গ্রুপ ষ্টেজের ম্যাচ চলাকালীনই স্কলারি ঘোষণা দেন টুর্নামেন্ট শেষেই তিনি পদত্যাগ করবেন কোচ হিসেবে। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আধা ঘন্টা পেরুবার আগেই ০-২ গোলে পিছিয়ে যায় পর্তুগাল, শেষ পর্যন্ত ৩-২ এ হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল।

নতুন কোচ কার্লোস কুয়েইরোজের অধীনে যাচ্ছেতাই খেলে পর্তুগাল, দল নির্বাচন, ফরমেশন, ট্যাক্টিক্স সবকিছুতেই ব্যর্থ। কোনোরকমে প্লেঅফ খেলে ২০১০ বিশ্বকাপে উত্তীর্ণ হয় পর্তুগাল। এই দশকটি ছিল পর্তুগাল ফুটবল ইতিহাসের সেরা দশক, ইউরো ২০০০, বিশ্বকাপ ২০০২, ইউরো ২০০৪, বিশ্বকাপ ২০০৬, ইউরো ২০০৮, এবং বিশ্বকাপ ২০১০ এর সবগুলোতেই তারা বাছাই পর্ব থেকে মূল পর্বে কোয়ালিফাই করে, অন্য মাত্র ৪টি ইউরোপিয়ান পাওয়ারহাউজ স্পেন, ইটালি, জার্মানি, ফ্রান্স এ কীর্তি গড়তে সক্ষম হয়। পর্তুগালও যে মেজর পাওয়ার হিসেবে ইউরোপিয়ান এলিটে আসন গড়ে নিচ্ছে, এতে এটারই প্রমান দেয় তারা। ২০১০ বিশ্বকাপে গ্রুপ অফ ডেথে পরে পর্তুগাল। সেখানে ছিল ৫ বারের ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, আফ্রিকার টপ কন্টেন্ডার দিদিয়ের দ্রগবার আইভরি কোস্ট, ১৯৯৬ এর প্রতিপক্ষ উত্তর আমেরিকা। গ্রুপের শেষ ম্যাচে ব্রাজিল, পর্তুগাল দুই দলই নিজেদের বাঁচিয়ে ডিফেন্সিভলি খেললেও রোনালদো একাই ত্রাস সৃষ্টি করে ব্রাজিল রক্ষণে, যতবারই বল পায়, ততবারই তার ক্ষিপ্র দৌড়ে সতর্ক থাকতে হয় ব্রাজিলিয়ানদের, কিন্তু অন্য প্লেয়াররা উঠে না আসায়, শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্রয়েই ম্যাচ শেষ হয়, রোনালদো হয় ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। ১৯ ম্যাচ অপরাজিত থাকার স্ট্রাইক নিয়ে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে যায় পর্তুগাল, এর মধ্যে মাত্র তিনটি গোল হজম করে তারা। স্পেনের সাথে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় টুর্নামেন্ট থেকে, পরবর্তীতে স্পেন ঐ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হয়। টুর্নামেন্ট জুড়েই কুইয়েরোজ তার অতিরিক্ত সতর্কতার ট্যাক্টিস নিয়ে সমালোচিত হন, টিমকে পিছনে দ্বার করিয়ে রেখে ডিফেন্স, উপরে একা ক্রিস্টিয়ানোর কাছে ডাইরেক্ট বল সামনে বাড়িয়ে রোনালদোর অপজিশনের ডিফেন্স বরাবর দৌড়ে লং শট নিয়ে ট্রিকি জাবুলানি বলের এডভান্টেজ নেয়াই ছিল তার ট্যাক্টিক্স। তার এই অ্যাপ্রোচ ওয়াইডলি সমালোচিত হয়, ডেকো প্রকাশ্যেই বিক্ষোভ করে, স্পেনের সাথে হারের পর টিমের পারফর্মেন্স নিয়ে রোনালদোকে জিজ্ঞেস করা হলে রন জবাব দেন, তুমি চাইলে কুইয়েরোজকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পার। যদিও পর্তুগাল তাদের প্রাথমিক লক্ষ ডেথ গ্রুপ থেকে উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং পরে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেনের কাছে ন্যূনতম ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়, তথাপি এটা বলা হয় যে, কোচ যদি আরেকটু অ্যামবিশিয়াস হত, তবে তারা অনেকদূর যেতে পারত। এর কয়েক মাস পরে ২০১২ ইউরো এর কোয়ালিফাই শুরু জাস্ট কিছুদিন আগে স্কোয়াডের রেগুলার খেলোয়াড় সিমাও, পাউলো ফেরেইরা, মিগুয়েল ক্লাব ফুটবলে আরও বেশি নজর দিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেয়। ২০১১ এর জানুয়ারিতে মিডফিল্ডার তিয়াগোও ব্যক্তিগত কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেয়।