ট্যাক্টিক্যাল এনালাইসিস: এফএ কাপ ফাইনাল – আর্সেনাল ২-১ চেলসি

“ওয়েঙ্গার আউট” স্লোগানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আর্সেনালকে নিয়ে ৭ম বারের মতন এফএ কাপ জিতলেন গানার্স কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার! তাও আবার এই মৌসুমের অন্যতম সেরা কোচ আন্তোনিও কন্তের ইপিএল চ্যাম্পিয়ন চেলসির সাথে! মৌসুম জুড়ে দুর্দান্ত খেলা চেলসির সাথে আর্সেনালের জয়টা কোন ফ্লুক ছিলো না – বরং যোগ্য দল হিসেবেই শনিবারের ম্যাচটি জিতেওয়েঙ্গারের আর্সেনাল। কন্তের চেলসি বধ করার পিছনে কি মন্ত্র জপে ছিলেন পুরো মৌসুম জুড়ে সমালোচনার শিকার ওয়েঙ্গার?

ওয়েঙ্গারের ম্যাচ ট্যাক্টিক্স দেখার আগে পুরো সীজনে দুর্দান্ত খেলা কন্তের চেলসির ট্যাক্টিক্স সম্পর্কে জানা যাক। এই সীজনে চেলসির ফর্মেশন ছিল ৩-৪-২-১, অন্যান্য ইপিএল দলগুলোর তুলনায় কিছুটা আনকনভেনশনাল। লুইজ, কাহিল, আজপিলিকুয়েতাকে নিয়ে ৩ জনের ব্যাকলাইন। এখানে এই সীজনেই পুরানো দল চেলসিতে ফেরা ডেভিড লুইজের রোল ছিল অনেকটা ক্লাসিক সুইপারের মতন, কখনো লাস্ট ডিফেন্ডার, কখনো সেন্টার দিয়ে আক্রমনে উঠা, কখনোবা কাহিল-আজপির সামনে সিডিএম হিসেবে থাকা। ২ ওয়াইড মিডফিল্ডার মোজেস-আলোন্সো মাঠের ২ ওয়াইড এরিয়া পিউর ফুলব্যাকদের মতন উঠানামা করে খেলেছেন। ডিফেন্সের সময় নিচে নেমে যেমন ৫ জনের ব্যাকলাইনে পরিনত করতেন, এটাকেও উইংগারের ভুমিকা নিয়ে হ্যাজার্ড-পেদ্রোদের কাট ব্যাক করার সুযোগ করে দিতেন। ২ পিভট কান্তে-ম্যাটিচ ছিলেন চেলসির ফুসফুসের মতন। ২ জনের মিডফিল্ড কন্ট্রোল ছিল চেলসির সাফল্যের অন্যতম কারন। এর মাঝে কান্তে ছিলেন ডেস্ট্রোয়ার রোলে আর ম্যাটিচ ডিস্ট্রিবিউটর রোলে। চেলসির বিল্ড আপটা হতো উইং দিয়ে ত্রিভুজ শেইপে শর্ট পাসিং করে এবং এটাকিংলি চেলসির শেইপটা থাকতো ক্লাসিক ২-৩-৫ ফর্মেশনে। একদম ফ্রন্টে কস্তার মুভমেন্ট ও হ্যাজার্ড-পেদ্রোদের জন্যে স্পেস ক্রিয়েট করে দিতো। মোটামুটি এই সিস্টেম দিয়েই কন্তে এবার চেলসির ইপিএল টাইটেল পুনরুদ্ধার করেছেন।

এইবার আসি ওয়েঙ্গারের ট্যাক্টিক্সে – যেকোনো দল কিংবা তাদের সিস্টেমকে বীট করতে হলে তাদের ঐ সিস্টেমের শক্তির দিকগুলো নিষ্ক্রিয় করতে হয় আর দুর্বল দিকটায় আঘাত হানতে হয়। ওয়েঙ্গারও তাই করছেন! চেলসির মতো ওয়েঙ্গারও দল সাজান ৩-৪-৩ ফর্মেশনে এবং চেলসির সিস্টেমকে অকার্যকর করতে মোটা দাগে বেছে নেন ৩ টা মন্ত্র – ১. হাই প্রেসিং, ২. রম্বস শেইপড জোনাল মার্কিং, ৩. এক্সপ্লয়টিং স্পেসেস বিহাইন্ড দ্যা লাইনস। আর্সেনাল শুরু থেকেই অনেক হাই প্রেস করা শুরু করে চেলসির হাফে। লুইজ, কাহিলরা আর্সেনালের হাইপ্রেসে ফ্রন্ট পাসের জায়গায় কোর্তোয়াকে ব্যাকপাস খেলেন কয়বার এবং কর্তোয়াও আর্সেনালের হাই প্রেসের মুখে পড়ে লং বলের আশ্রয় নেন। নিজেদের হাফে কান্তে, ম্যাটিচরাও হার্ড প্রেসিং এর কারনে চেলসির বিল্ড আপে সাহায্য করতে পারছিলেন না। কান্তেরাও ফরোয়ার্ড পাসের জায়গায় ব্যাকপাস খেলেন এবং সেই ব্যাকলাইনেও হার্ড প্রেসিং এর ধরুন প্রথম দিকে চেলসির একমাত্র অপশন ছিল লং পাস। এর মাঝে কস্তা সবসময় ৩ জন গানার্স সিবির কড়া মার্কিং এ ছিলেন, তাই তার উদ্দেশ্যে বাড়ানো বেশিরভাগ লং বলই আর্সেনাল রিকোভার করতে সক্ষম হয়। এছাড়াও পিচের বিভিন্ন জায়গায় চেলসির খেলা ঐ লংবলগুলো রিকোভার করতে আর্সেনাল ভালোভাবেই প্রস্তুত ছিল, তাই প্রথম হাফে বলের দখলও আর্সেনালের ভালো ছিল।

হাই প্রেসিং এ চেলসিকে লং বল খেলতে ফোর্স করা ছাড়াও আর্সেনাল চেলসির গ্রাউন্ড পাসিং ঠেকাতে সলিড ছিল তাদের কড়া জোনাল মার্কিং দিয়ে। ওয়াইড এরিয়া দিয়ে কোন দলের বিল্ড আপ ঠেকাতে বেশিরভাগ দল সেই সাইড দিয়ে ন্যারো মার্কিং করে অনেকটা স্ট্রেইট লাইন ফর্ম করে। কিন্তু সাইড ওয়ে দিয়ে চেলসির ত্রিভুজ শেইপের পাসিং, বিল্ড আপ ঠেকাতে আর্সেনাল স্ট্রেইট লাইনের জায়গায় ত্রিভুজ শেইপে জোনাল ডিফেন্ডিং শুরু করে এবং কয়েকটি ত্রিভুজ শেইপের জোন গঠন করে আর্সেনাল প্লেয়াররা চেলসি যেই সাইড দিয়ে গেম বিল্ড আপ করবে সেখানে নিজেরা মিলে ২-৩ টি রম্বস জোন ফর্ম করে। ফ্লুইড পাসিং এবং বল রিসিভিং এর জন্যে বল হোল্ডিং টিমের প্লেয়ারদের অপোনেন্ট প্লেয়ারদের গ্যাপে একটু পিছনে অবস্থান নিতে হয়, যেখানে তার কাছাকাছি কোন অপোনেন্ট প্লেয়ার থাকে না। মিডফিল্ডে ৬-৭ মিলে এরকম ২-৩ টি রম্বস গঠন করার জন্যে চেলসি প্লেয়াররা এই অপশনটা কাজে লাগাতে পারছিলোনা। কারন ২ জন আর্সেনাল প্লেয়ারের গ্যাপের পিছনে একজন আর্সেনাল প্লেয়ার ছিলো এবং এই রম্বস শেইপের জোনাল ডিফেন্ডিং থেকে বল রিকোভার করার পর আর্সেনালের ইমেডিয়েট বিল্ড আপ ও কুইক হচ্ছিল, কারন প্লেয়াররা অলরেডি ত্রিভুজ-রম্বস শেইপে ছিল! আর্সেনালের হয়ে মিডফিল্ডে বল ইন্টারসেপ্ট এবং সেই বল এটাক বিল্ড আপে ডিস্ট্রিবিউশনের কাজটা জাকা অনেক ভালোভাবেও করেন এই ম্যাচে। জাকা মিডফিল্ড লাইনের উপরে এই ম্যাচে উঠেনই নাই বলতে গেলে, হাফলাইনে পজিশন নিয়ে পুরো খেলাই ডিক্টেট করে গেছেন। আর্সেনালের এই হাই প্রেসিং আর মিডফিল্ডে রম্বস শেইপে ন্যারো জোনাল ডিফেন্ডিং চেলসিকে নিজেদের হাফ থেকে তাদের শর্ট পাসিং বিল্ডাপ করতেই দেয় নাই। চেলসির লং পাস থেকে আর্সেনাল ভালোভাবেই বল রিকোভার করছিল এবং তাদের বিল্ড আপটা মিডফিল্ড থেকেই শুরু হচ্ছিল, তাই প্রথম হাফের ডমিনেন্স পুরোটাই আর্সেনালের!

লং বলল কিংবা এরিয়াল বলে চেলসি যে একেবারেই অসফল ছিল তা কিন্তু না, বেশ কয়েকটা আক্রমন এবং কস্তার গোলটাও এয়ার বল থেকে দুর্দান্ত রিসিভিং এর পর করা। ২য় হাফে চেলসি ১০ জনের দলে পরিনত হলে আর্সেনাল এক্সট্রা ম্যানের সুবিধা নিতে নিজেদের হাফ থেকে শর্ট পাসিং বিল্ড আপ সিস্টেমে খেলা শুরু করে। এই সময় চেলসিও আর্সেনালের মত হাই প্রেসিং করে একজনের অভাব বুঝতে দেয় নাই এবং প্রথম হাফের আর্সেনালের মতন নিজেদের খেলা খেলার সুযোগ পেতে থাকে। শুরু থেকে আর্সেনালের এটাকের মূলমন্ত্র ছিল চেলসির ব্যাকলাইন, মিডফিল্ড লাইন কিংবা ফুলব্যাকদের পেছনের স্পেসে লং বল খেলে এবং সেখান থেকে স্প্রিন্ট করে চান্স ক্রিয়েট করা। আর্সেনাল এভাবে অনেকবার আক্রমন শানায় এবং ম্যাচ উইনিং গোলটাও এভাবেই আসছে! রাইট সাইডে মোজেসের পিছনের স্পেসে বল ফেলে সানচেজ, সেখান থেকে জিরুডের ক্রসে গোল করেন মিডফিল্ড থেকে অভারল্যাপ করা রামসে! কান্তের মার্কিং দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আর্সেন ওয়েঙ্গারের সপ্তম এফএ কাপ জয় নিশ্চিত করেন রামসে! এই আনমার্কিংসহ পুরো ম্যাচেই ফ্লপ ছিলেন এই সীজনে চেলসির অন্যতম সেরা খেলোয়াড় কান্তে! চেলসিও শেষদিকে আর্সেনালের ডিফেন্স লাইনের পিছনে লং বল খেলে গোলের চেস্টা করে এবং কিছু লং রেঞ্জ শটও নেয় – কিন্তু দিনটা এদিন ছিল আর্সেনালের, আর্সেন ওয়েঙ্গারের . . . . .

শেষ খবর অনুসারে ওয়েঙ্গার আরো ২ বছরের জন্যে আর্সেনালের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে যাচ্ছেন। ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল ফলাফলের দিক দিয়ে একঘেয়েকর হতে পারে, ঘুরেফিরে টপ ফোর আর ইউসিএল রাউন্ড সিক্সটিন পর্যন্ত দৌড়াতে পারে – বাট হি ইজ এ গ্রেট কোচ ইউ হ্যাভ টু এডমিট! আর্সেনাল তার হাত ধরেই আবারো ঘুরে দাঁড়াবে সেই আশাই করি – ততদিন পর্যন্ত “ওয়েঙ্গার আউট” কোরাস শুনে যাই . . . . .